
Tawang district
বর্তমান ভারতে Arunachal Pradesh অরুণাচল প্রদেশের একেবারে পশ্চিম সীমান্তে থাকা একটি জেলা তাওয়াং Tawang district। উত্তরে চিন, দক্ষিণ-পশ্চিমে ভুটান এবং পূর্বদিকে সি লা পর্বত ঘিরে রেখেছে একে। এই জেলার ইতিহাসে চিনের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া এবং পরে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার সময় বহু দেশীয় রাজ্য এবং ফরাসি ও পর্তুগিজদের উপনিবেশ রাজ্যগুলি ভারতের মূল মানচিত্রে সংযুক্ত হয়, কোন কোন রাজ্য আবার সংযুক্ত হতেও চায়নি।
সেই নিয়ে দেশীয় রাজ্যগুলির সংযুক্তিকরণ ভারতের ইতিহাসে এক বিরাট ঘটনা আর এরই অংশ হিসেবে Tawang district তাওয়াং সংযুক্তিকরণ এর বিষয়টিও এক্ষেত্রে খুবই উল্লেখযোগ্য। চিন চেয়েছিল ভারতের অরুণাচল প্রদেশ দখল করে নিতে এবং তাওয়াং প্রদেশকে নিজেদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করত্রে। ভারতের কাছে তাওয়াং প্রদেশ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্রহ্মপুত্র নদীর উত্তরে এই তাওয়াং-এর রাস্তা ধরে খুব সহজে ইন্দো-চিন সীমান্তে পৌঁছানো সম্ভব।অরুণাচল প্রদেশকে চিন দক্ষিণ তিব্বত বলেও সম্বোধন করতো একসময় এবং চিনের অরুণাচলকে দখল করার এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এক ভারতীয় নাগা সেনা। ১৯৫১ সালে সমুদ্রতল থেকে দশ হাজার ফুট উচ্চতায় তিনি ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করে অরুণাচলে চিনের সমস্ত হস্তক্ষেপ অস্বীকার করেন।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মেজর খাতিং এবং আসামের তৎকালীন রাজ্যপাল জৈরামদাস দৌলতরাম এই কাজে যথাসাধ্য সহায়তা করেন। দৌলতরাম বুঝতে পেরেছিলেন যে Tawang district তাওয়াং এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে যে একে দখলে রাখবে সমগ্র উত্তর-পূর্বাংশে তারই দখল থাকবে। তাই Tawang district তাওয়াং সংযুক্তিকরণ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।এর আগে ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের সিমলা চুক্তি অনুযায়ী ভারত ও তিব্বতের সীমারেখার জন্য বিতর্কিত ম্যাকমোহন লাইন অস্বীকার করে চিন সরকার। চিন সরকার চেয়েছিল সি লা গিরিখাত বরাবর ম্যাকমোহন লাইন চলে যাক যাতে তাওয়াং তিব্বতের মধ্যে থাকে। ফলে ভারত ও চিনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে। এই সময় তৎকালীন ব্রিটিশ বিদেশ-সম্পাদক হেনরি ম্যাকমোহন তিব্বতের দলাই লামাকে সিমলায় এসে ভারত ও তিব্বতের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি করান।
এমনকি তাদের দুজনের মধ্যে তিব্বতের দক্ষিণাংশের সীমানা নিয়েও একট স্পষ্ট চুক্তি হয়। এটিই সিমলা চুক্তি নামে পরিচিত যেখানে ভারত ও তিব্বতের সীমানার মধ্যে মূলত তিনটি বাফার রাজ্য কল্পিত হয় – নেপাল, সিকিম ও ভুটান। ভুটানের পূর্বদিকে দিরাং জং অঞ্চল সে সময় একেবারেই যাতায়াত ও বাসস্থানের অযোগ্য ছিল। ঐ অংশেই ১৯৫৪ সালে গড়ে ওঠে নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি।ম্যাকমোহন লাইনের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত Tawang district তাওয়াং প্রদেশ ১৯৫১ সালে একটি দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। তাওয়াং-এর শাসক লাসায় তিব্বত সরকারের আনুগত্য স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ভারত সরকার তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। ১৯৫১ সালেই আসামের রাজ্যপাল দৌলতরাম অবসরপ্রাপ্ত মেজর খাতিংকে তাওয়াং-এর উপর নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য শান্তিপূর্ণ অভিযানে সামিল করেন।
২ নং আসাম রাইফেলসের সার্ভিং অফিসার হিসেবে নিযুক্ত মেজর খাতিং কোষাগার থেকে পঁচিশ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন অভিযানের প্রয়োজনে এবং দৌলতরামের কাছে দু মাস সময় চেয়ে নেন। কিন্তু দৌলতরাম তাঁকে মাত্র পয়ঁতাল্লিশ দিন সময় দেন অভিযান সফল করার জন্য। সেনাবাহিনীর সকলকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে মেজর খাতিং নীচে নেমে এসে মার্কিন সেনাদের ফেলে যাওয়া সরঞ্জামের মধ্যে থেকে অ্যাঙ্গোলা শার্ট, তাঁবু ইত্যাদির মতো অভিযানে সাহায্যকারী আরো অনেক উপাদান সংগ্রহ করেন।এই সমস্ত জিনিসগুলি নিয়ে তিনসুকিয়া রেলস্টেশনে যান এবং সেখান থেকে গৌহাটি হয়ে তেজপুরে আসেন। কারণ তখন ব্রহ্মপুত্র নদী বরাবর এটিই ছিল তখন একমাত্র রেলপথ। এরপরে ডিব্রুগড় থেকে নদীপথে একটি নৌকা করে তিনি চলে আসেন মাজুলি দ্বীপে এবং তারপর নদীর উত্তর ধার বরাবর হাতির পিঠে চেপে নদী পার হয়ে একজন ব্রিটিশ চা-উৎপাদনকারীর ভাঙা জিপ নিয়ে মেজর খাতিং চলে আসেন তেজপুরে। সেনাদল পৌঁছানোর আগেই তিনি অভিযানের উপযোগী সবরকম ব্যবস্থাপত্র করে রাখেন।
এরপরে সেনাদল পৌঁছালে তাদের নিয়ে তেজপুর থেকে ২০ কিমি উত্তরে লোকরায় বেস ক্যাম্প করেন। সেখানে দীর্ঘ তিন সপ্তাহ ধরে সেনাবাহিনীর সকলকে মেজর খাতিং প্রশিক্ষণ দেন, আসাম রাইফেলস-এর একজন নায়েক হিসেবে আরো উপরে ক্যাম্প করার জন্য সেনাদের পাঠাতে থাকেন। এদিকে তাদের এই সমস্ত কার্যকলাপ নজরে পড়ে যায় ডিব্রুগড়ের ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার মেজর টি সি অ্যালেনের। মেজর খাতিং তাঁকে বলেন হয় তিনি তাঁদের সঙ্গে যোগ দেবেন নচেৎ অভিযান শেষে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।একজন দক্ষ পর্বতারোহী হওয়ার কারণে নিজে থেকে মেজর অ্যালেন এই অভিযানে থাকতে সম্মত হন। ১৯৫১ সালের ১৭ জানুয়ারি লোকরা থেকে মূল অভিযান শুরু হয়। অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় রাস্তাঘাট ভালো ছিল না। তবু মেজর খাতিং তাঁর দলকে নিয়ে খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে সমর্থ হন। নয় দিনের মধ্যে বম্বডিলার ডিজং-এ এসে পৌঁছান তারা। ১৯৫১ সালের ২৬ জানুয়ারি ডিজং-এর মাটিতে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন মেজর খাতিং এবং স্থানীয় মানুষদের তিনি একটি ভোজসভায় আহ্বান করেন।
ঐ এলাকায় সামন্ত রাজা কুটুক লামা তাওয়াং-এর শাসকের কাছে আনুগত্য প্রদর্শন করতেন। এদিকে ভোজসভার খবর পেয়ে গৌহাটি থেকে ডাকোটা পাঠান রাজ্যপাল এবং কয়েকটি বিমান এসে স্থানীয় বৌদ্ধ মঠগুলির উপর দিয়ে চার-পাঁচবার পাক খেয়ে সৈন্যদের দেখেই বুঝতে পেরে যায় তাওয়াং দখল হতে চলেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখে সি লা গিরিখাতের কাছে চেকপুরপু ও সেঙ্গে ডিজং-এ এসে উপনীত হন মেজর খাতিং। ধীরে ধীরে আরো উপরে উঠতে থাকেন তিনি।একজন দো-ভাষীর মাধ্যমে তিনি স্থানীয় মানুষদের বোঝান যে তারা এখন স্বাধীন ভারতের অংশ আর তাই কাউকে আনুগত্য প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা নেই তাদের। ১৯৫১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মেজর খাতিং তার সেনাবাহিনী নিয়ে তাওয়াং-এ এসে পড়েন। প্রথম দু’দিন তারা একটি উপযুক্ত মাঠের মতো প্রশস্ত জায়গা খুঁজে বের করেন। মেজর খাতিং তাঁর সেনাবাহিনী ও মালবাহকদের নির্দেশ দেন সামরিক আস্তানা গড়ে তুলতে এবং সংবাদপ্রেরকের মাধ্যমে তাওয়াং-এর শাসক ডিজংপেনকে সাক্ষাতের কথা জানান।
তিন দিন পরে পাহাড়ের ধার বরাবর কুড়ি রাউণ্ড গুলি চালাতে নির্দেশ দেন মেজর খাতিং এবং একইসঙ্গে হাজার রাউণ্ড গুলি চালাতে বলেন শূন্যে। পাহাড়ের এক কোণে বদ্ধ স্থানে গুলি-গোলার শব্দের ধ্বনি-প্রতিধ্বনির যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তাকে মেজর ‘ভয়েস অফ গড’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তাওয়াং প্রদেশে চার ঘন্টা ধরে মেজর খাতিং তাঁর সেনাদল নিয়ে ভ্রমণ করেন এবং মঠের সামনেই ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এই সময়েই মেজর অ্যালেনকে তিনি নির্দেশ দেন ডিজংপেনের সঙ্গে একটি মীমাংসায় এসে প্রথানুগ সংযুক্তিকরণের প্রক্রিয়া সমাধা করতে।২০ ফেব্রুয়ারি ছেগারগানে তাওয়াং শাসক নায়েরস্যাং-এর প্রাসাদে কথা বলার জন্য যান মেজর অ্যালেন। নায়েরস্যাং লাসায় দলাই লামার কাছ থেকে পরামর্শ চাইছিলেন কিন্তু মেজর অ্যালেন যখন বোঝান যে চিন তিব্বত আক্রমণ করে দখল করে নিয়েছে এবং তিব্বতের সঙ্গে ভারতের একটি চুক্তি হয়েছে যার দ্বারা ম্যাকমোহন লাইনের দক্ষিণের এই তাওয়াং প্রদেশ ভারতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ফলে বর্তমানে Tawang district তাওয়াং-এর কোনো পৃথক শাসকের প্রয়োজন নেই। আর এই কথার সঙ্গে সঙ্গে পকেটের পিস্তলটি বের করে মাটিতে রাখলে মেজর অ্যালেনের কথায় আর কোনো দ্বিরুক্তি না করে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন নায়েরস্যাং। ভারতে সংযুক্তিকরণের জন্য নজরানা হিসেবে তাঁকে হাজার টাকা দেওয়া হয়। ভারত সরকার যতক্ষণ না পর্যন্ত এই অঞ্চল নিজেদের প্রতিনিধি স্থাপন করতে পারছে, ততদিন মেজর খাতিং-এর নির্দেশে মেজর অ্যালেন এখানকার লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন।দৌলতরামের নির্ধারিত সময়ও শেষ হয়ে আসছিল। কাজ শেষ করে দিল্লিতে ফিরে যান মেজর খাতিং। এর আরো কয়েক বছর পরে চৌ-এন-লাইয়ের সঙ্গে কথা বলে তিব্বতের সঙ্গে একটি আট বছরের চুক্তি সম্পাদন করেন জওহরলাল নেহরু যা পরে ‘ইন্দো-চিন চুক্তি’ নামে পরিচিত হয়।
১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসে তাওয়াং প্রদেশের উপর ‘নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি’র অধীন বলে ঘোষণা করে ভারত সরকার এবং মেজর অ্যালেনের বদলে নিজস্ব একজন প্রতিনিধি পাঠায় ঐ অঞ্চল পরিদর্শনের জন্য। এরপর থেকেই অরুণাচল প্রদেশকে অখণ্ড ভারতের অংশ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাওয়াং প্রদেশও ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। বিন্দুমাত্র রক্তপাত না করে মেজর খাতিং-এর এই যুদ্ধজয় ভারতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
আরো পড়ুন পশ্চিমবঙ্গ জীবনী মন্দির দর্শন ইতিহাস জেলা শহর লোকসভা বিধানসভা পৌরসভা ব্লক থানা গ্রাম পঞ্চায়েত কালীপূজা যোগ ব্যায়াম পুজা পাঠ দুর্গাপুজো ব্রত কথা মিউচুয়াল ফান্ড জ্যোতিষশাস্ত্র ভ্রমণ বার্ষিক রাশিফল মাসিক রাশিফল সাপ্তাহিক রাশিফল আজকের রাশিফল চানক্যের নীতি বাংলাদেশ লক্ষ্মী পূজা টোটকা রেসিপি সম্পর্ক একাদশী ব্রত পড়াশোনা খবর ফ্যাশন টিপস