Chaitanya Saraswat Math
নবদ্বীপের শ্রী চৈতন্য সারস্বত মঠ (Sri Chaitanya Saraswat Math) গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, যা গঙ্গার শান্ত তীরে অবস্থিত। এই মঠের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্রীল ভক্তি রক্ষক শ্রীধর দেব গোস্বামী মহারাজ, যিনি তাঁর গুরু শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদের উপদেশ ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৪১ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। নবদ্বীপ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মভূমি হিসেবে অমর হয়ে আছে, এবং সেই পবিত্র ভূমিতেই এই মঠ ভক্তি আন্দোলনের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ১৫ শতকে জন্মগ্রহণ করে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মকে নতুন দিশা দিয়েছিলেন, যেখানে ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরপ্রেমই ছিল মূল সাধনা। সেই ভক্তি ও প্রেমের ধারাকেই শ্রী চৈতন্য সারস্বত মঠ আজও বহন করে চলেছে।
মঠটি গঙ্গার পাড়ে অবস্থিত হওয়ায় এর পরিবেশ বিশেষভাবে মনোরম। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মঠে শুরু হয় মঙ্গল আরতি, যা ভক্তদের মনে অপার আনন্দ জাগায়। এরপর চলে নামসংকীর্তন, ভজন, শাস্ত্র পাঠ ও গুরু-পরম্পরার স্মরণ। প্রতিদিন ভোর ও সন্ধ্যায় মঠ চত্বরে কীর্তনের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে, আর গঙ্গার বাতাসে মিশে যায় মৃদু মৃদু মন্ত্রোচ্চারণ। মঠের মূল মন্দিরে শ্রীশ্রী গৌর-নিতাই, শ্রীশ্রী রাধা-গোবিন্দ, শ্রী গৌর গদাধর এবং গুরু-পরম্পরার সুন্দর বিগ্রহ সুসজ্জিতভাবে প্রতিষ্ঠিত আছে। ভক্তরা তাঁদের দর্শন করে, পূজা করে এবং প্রভুর সেবা করতে করতে নিজেদের জীবন ধন্য করেন।
গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের অন্যতম প্রধান তিথি গৌর পূর্ণিমা এখানে মহাসমারোহে পালিত হয়। এই দিনে মঠে হাজারো ভক্ত সমবেত হন, চারদিকে শঙ্খধ্বনি ও কীর্তনের সুরে ভরে ওঠে নবদ্বীপের আকাশ। ভক্তরা শোভাযাত্রায় অংশ নেন, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা স্মরণ করেন এবং সারাদিন ধরে চলে ভোগ নিবেদন ও প্রসাদ বিতরণ। শুধু গৌর পূর্ণিমাই নয়, জন্মাষ্টমী, রথযাত্রা, নন্দোৎসবসহ নানা বৈষ্ণব উৎসবও এখানে একইভাবে উদযাপিত হয়। প্রতিটি উৎসবেই থাকে গান, নৃত্য, ভক্তি আলোচনা এবং প্রচুর প্রসাদের আয়োজন, যা সকলের মনকে ভক্তিময় করে তোলে।
শ্রীল ভক্তি রক্ষক শ্রীধর দেব গোস্বামী মহারাজ এই মঠকে কেবল পূজার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং একটি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানে ভক্তদের শ্রীমদ্ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, ভাগবদ্গীতা প্রভৃতি শাস্ত্র অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। বহু সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ ভক্ত এখানে এসে আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সাধনার পথ শিখে থাকেন এবং পরে বিশ্বব্যাপী গিয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি বার্তা প্রচার করেন। এইভাবে মঠ শুধু ভারতের মধ্যে নয়, বিদেশেও গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচারকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
মঠের দৈনন্দিন জীবনে ভক্তি, শৃঙ্খলা ও বিনয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। ভোরের প্রার্থনা থেকে রাতের শেষ আরতি পর্যন্ত প্রতিটি সময়সূচি নির্ধারিত এবং ভক্তরা সেই নিয়ম মেনে চলেন। অতিথি ও ভক্তদের জন্য এখানে প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে, যেখানে সম্পূর্ণ নিরামিষ, সাত্ত্বিক আহার পরিবেশন করা হয়। এছাড়াও মঠ মানবসেবামূলক কার্যক্রমেও সক্রিয়, যেমন গরীবদের খাদ্যদান, বস্ত্রদান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা প্রদান।
দেশি-বিদেশি অসংখ্য ভক্ত নবদ্বীপে এলে এই মঠে দর্শন করতে আসেন। অনেকেই এখানে কয়েকদিন থেকে ভক্তিমূলক পরিবেশে সময় কাটান। গঙ্গার তীরে বসে কীর্তন শোনা, মন্দির প্রাঙ্গণে ধ্যান করা বা শাস্ত্র পাঠে মনোনিবেশ করা—এসব ভক্তদের অন্তরে এক অনন্য শান্তি এনে দেয়। মঠের স্থাপত্যও প্রশংসনীয়—প্রশস্ত আঙিনা, সুসজ্জিত ফুলের বাগান, গঙ্গামুখী বারান্দা এবং বিগ্রহের জন্য নির্মিত সুশোভিত বেদি সব মিলিয়ে এটি এক সৌন্দর্যমণ্ডিত তীর্থক্ষেত্র।
শ্রী চৈতন্য সারস্বত মঠে এসে শুধু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানই দেখা যায় না, বরং অনুভব করা যায় গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের মূল মর্ম—ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরপ্রেম লাভ। এখানে গঙ্গার স্রোতের মতোই প্রবাহিত হয় নামসংকীর্তনের ধারা, যা যুগ যুগ ধরে ভক্তদের মনে অনন্ত আনন্দের সঞ্চার করছে। নবদ্বীপে আগত যে কোনও আধ্যাত্মিক অন্বেষীর জন্য এই মঠ এক অবিচ্ছেদ্য গন্তব্য, কারণ এখানে এসে মন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভক্তিতে নিমগ্ন হয়, হৃদয় শান্তি লাভ করে এবং আত্মা প্রভুর সান্নিধ্যে আবদ্ধ হয়। শ্রী চৈতন্য সারস্বত মঠ সেই চিরন্তন প্রেম, করুণা ও ভক্তিরই এক জীবন্ত প্রতীক, যা নবদ্বীপের গৌরব ও বিশ্ববৈষ্ণব সমাজের এক অমূল্য রত্ন।
গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের একটি অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। এই মঠ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- প্রতিষ্ঠাতা: এই মঠটি ১৯৪১ সালে শ্রীল ভক্তি রক্ষক শ্রীধর দেব গোস্বামী মহারাজ (১৮৯৫-১৯৮৮) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদের অন্যতম প্রধান শিষ্য ।
- অবস্থান: এটি পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার নবদ্বীপের কোলদ্বীপ (Dearapara) এলাকায় ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত।
- দর্শনীয় স্থান: মঠের ভেতরে শান্ত ও মনোরম পরিবেশে বেশ কিছু মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে শ্রী গোবিন্দ কুণ্ড এবং তার মাঝখানে অবস্থিত মন্দির (যা ‘জল মন্দির’ নামেও পরিচিত) পর্যটক ও ভক্তদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এছাড়া এখানে একটি ছোট চিড়িয়াখানা ও বাগান রয়েছে ।
- আধ্যাত্মিক ধারা: এই মঠটি ‘ব্রহ্ম-মাধ্ব-গৌড়ীয় সম্প্রদায়’-এর অন্তর্ভুক্ত এবং শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর শুদ্ধ ভক্তিযোগের আদর্শ প্রচার করে। বর্তমানে এর শাখা বিশ্বজুড়ে ১০০-র বেশি দেশে বিস্তৃত ।
- পরিদর্শনের সময়: প্রতিদিন সকাল ৮:০০টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০টা পর্যন্ত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য মঠ খোলা থাকে।
- যাতায়াত: নবদ্বীপ ধাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে মাত্র ২০-৩০ টাকার অটো রিকশা বা টোটো ভাড়া করে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়।
আপনার পছন্দের খবর আর আপডেট এখন পাবেন আপনার পছন্দের চ্যাটিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াটস অ্যাপেও। যুক্ত হতে ক্লিক করুন Aaj Bangla হোয়াটস অ্যাপ চ্যানেলে।